তের জমিদারের ঐতিহাসিক নগর কলসকাঠী

লেখক:
প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৪, ৪:০২

খান মেহেদী :- কলসকাঠী একটি প্রাচীন জনপদ। কলসকাঠীতে তের জমিদারের বসবাস। বস্তুত পক্ষে কলসকাঠীর ইতিহাস জমিদারীর ইতিহাস। ১৭০০ সালের গোড়ার দিকে জমিদার জানকি বল্লভ রায় চৌধুরী কলসকাঠী স্থাপন করেন। আগে এর নাম ছিল কলুসকাঠী; কলুসকাঠী অপভ্রষ্ট কলসকাঠী।

জানকী বল্লভ রায় চৌধুরী ছিলেন গারুড়িয়ার জমিদার রামাকান্তের পুত্র। জানকী বল্লভ রায় চৌধুরীরা ছিলেন দুই ভাই। বড় ভাই রাম বল্লভ। জানকী বল্লভকে হত্যার চক্রান্ত করে রাম বল্লভ। জানকী বল্লভ তার বৌদির মাধ্যমে হত্যার বিষয়টি জানতে পেরে রাতের আধারে গারুড়িয়া ত্যাগ করে মুর্শিদাবাদ চলে যান। সেখানে তিনি নবাবের কাছে সমস্ত ঘটনা খুলে বলেন এবং নবাব তাকে অরংপুর পরগনার জমিদার হিসেবে নিয়োগ করেন। যতদূর পর্যন্ত ভাটা তত দূর পর্যন্ত জানকী বল্লভের পাট্টা ছিল। জমিদারী পেয়ে তিনি কলসকাঠীতে এসে বসতি স্থাপন করে। কলসকাঠীর তের জমিদার মূলত জানকী বল্লভের পরবর্তী বংশধর।

প্রায় তিনশ বছরের বেশি সময় ধরে এখানে জমিদার বাড়ি। এই জমিদার বাড়ি এখনও শক্ত কাঠামো ভিত হয়ে দাড়িয়ে আছে, কিন্তু এখন নিঃসন্দেহে সংস্কারের দাবি রাখে। বাড়ির মানুষজনের কাছে শুনেছিলাম তাদের অর্থনৈতিক দুরাবস্থার কথা। আবার সরকারিভাবেও এদিকে নেই কোন দৃষ্টি। বলা হয় এখানে তের জমিদারের বসবাস ছিল।

আসলে কলসকাঠীকে একটি পৃথক জমিদার বাড়ি না বলে, বলা যায় পূর্ণাঙ্গ একটি প্রাচীন শহর। অনেকটা সোনারগাঁওয়ের পানাম নগরের মতো। এখানে জমিদার বাড়িগুলো বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে আছে। মূল জমিদার বাড়ি থেকে বের হয়ে পাশের আরেকটি পুরনো বাড়ি আছে এখানে। এখানে বেশির ভাগই হিন্দুদের বসবাস।

কলসকাঠীতে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক চর্চা ছিল জমিদার আমল থেকেই। জমিদার আমলে কলকাতা থেকে নামীদামী ফুটবল খেলোয়ার আসত কলসকাঠীতে ফুটবল খেলতে। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল গান, নাটক ও যাত্রাপালা।
১৯০৮ সালে কলসকাঠীতে বান্ধব সমিতি গঠিত হয় এবং নরেন্দ্র রায় চৌধুরী শক্তি লাইব্রেরী তৈরি করেন। ১৯১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রাম কৃষ্ণ মিশন। ১৯৩০ সালে ‌‌‘লবণ আইন’সহ অন্যন্য আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করে কলসকাঠীর জনগণ। কলসকাঠী থেকে ‘লবণ আইন’ অমান্য আন্দোলনে যোগদানের জন্য কাথি অভিমুখে যাত্রা করেন শরবিন্দু মুখোপাধ্যায় (কষ্ট), কালীপদ মুখোপাধ্যায়, মনোরঞ্জন দত্ত, মহেন্দ্র দত্ত এবং মধুসুদন দত্ত।
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হওয়ার পর সকল জমিদার ভারতের পশ্চিম বঙ্গে চলে যান। শুধু মাত্র বিজয় রায় চৌধুরী ১৯৬৮ সালে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন।

১৯৭০ সালের নির্বাচনী প্রচারনা চালাতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কলসকাঠীতে আসেন। বর্তমান কলসকাঠী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে তিনি জনসভা করেন।

উল্লেখ্য, ১৮৮২ সালে জমিদার বরদাকান্ত রায় চৌধুরী কলসকাঠী হাইস্কুল ও প্রাথমিক বিদ্যালয় (কলসকাঠী বি.এম.একাডেমী ও কলসকাঠী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করেন।

কলসকাঠি জমিদার বাড়ির অনেক স্থাপনা বিলীন হয়ে গেছে কালের গহ্বরে, এ বছরের শুরুতে মূল জমিদার বাড়ি ভাঙতে নিছিলো কিছু লোক পরবর্তীতে বিভিন্ন হস্তক্ষেপে সেটি বন্ধ হয়।