কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খামারবাড়িতে কর্মরত অডিটর মহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়স ও স্থায়ী ঠিকানা জালিয়াতি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ঘুষ বাণিজ্য এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর পৃথক লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, মহিদুল ইসলামের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগরে হলেও ২০০৪ সালে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার বান্দরছড়া এলাকার বাসিন্দা পরিচয়ে রাঙামাটি জেলায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালকের কার্যালয়ে অফিস সহকারী পদে চাকরিতে যোগ দেন তিনি। অভিযোগকারীর দাবি, ওই ঠিকানায় তাঁর স্থায়ী বসবাসের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। আরও অভিযোগ করা হয়েছে, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের নির্ধারিত বয়সসীমা অতিক্রম করার পর এসএসসি সনদে বয়স পরিবর্তন করে চাকরি নেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডে সনদ যাচাই এবং নিয়োগসংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে। বেতন নির্ধারণের সময় রাঙামাটির হিসাবরক্ষণ অফিস আপত্তি জানিয়েছিল এবং পরে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করা হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রাঙামাটিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালকের কার্যালয়ের ভবন নির্মাণকাজ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে। এতে বলা হয়, তৎকালীন সহকারী পরিচালক (অর্থ) সৈয়দ শরিফুল ইসলামের সঙ্গে যোগসাজশে মহিদুল ইসলাম ওই কাজের দেখভালের দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগকারীর দাবি, বাস্তবে কাজ সম্পন্ন না করেই বিল-ভাউচার তৈরি করে বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন করা হয় এবং সেই অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে ভাগাভাগি করা হয়। পরবর্তী সময়ে মহিদুল ইসলামকে মানিকগঞ্জে বদলি করে অর্থ, হিসাব ও নিরীক্ষা শাখায় অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার পেছনেও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। ওই শাখায় দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন বরাদ্দের বিপরীতে কমিশন আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
মহিদুল ইসলামের নামে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ থাকার অভিযোগও করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, কুমিল্লা শহরে ছয় কাঠা জমির ওপর চারতলা বাড়ি, মুরাদনগরে প্রায় ৫০০ বিঘা আবাদি ও অনাবাদি জমি এবং ঢাকার বিশ্বরোড এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে তাঁর। পাশাপাশি তাঁর ও স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব সম্পদের বৈধ আয়ের উৎস অনুসন্ধান এবং আয়কর ও সম্পদ বিবরণীর সঙ্গে মিলিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।
এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু পরিষদ, খামারবাড়ির সাবেক সভাপতি সৈয়দ রেজাউল করিমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্র ধরে বিভিন্ন প্রকল্প ও কর্মচারীদের কাছ থেকে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের নামে জোরপূর্বক অর্থ আদায়, টেন্ডার ও বদলি বাণিজ্যে সম্পৃক্ততার অভিযোগও আনা হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট মহিদুল ইসলাম ও সৈয়দ রেজাউল করিমের নেতৃত্বে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে চাপ দেওয়া হয় এবং সংসদ ভবন এলাকার কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া হয়। এ-সংক্রান্ত ছবি থাকার কথাও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে তথ্য যাচাই এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া প্রয়োজন।
বর্তমানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অডিট শাখায় কর্মরত মহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি ও অনাপত্তিপত্র (এনওসি) প্রদানের ক্ষেত্রেও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগপত্রে নূর আলম নামে অধিদপ্তরের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, বিভিন্ন অর্থবছরে তাঁর স্বাক্ষরিত বিল-ভাউচারের বিপরীতে বিপুল অঙ্কের অডিট আপত্তি থাকা সত্ত্বেও অর্থের বিনিময়ে আপত্তি নিষ্পত্তি করে অনাপত্তিপত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, এ ধরনের অনিয়মের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
অভিযোগকারী এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, মহিদুল ইসলামের নিয়োগসংক্রান্ত এসএসসি সনদ ও স্থায়ী ঠিকানার সত্যতা যাচাই, রাঙামাটির ভবন নির্মাণকাজের বিল-ভাউচার ও প্রকল্পের নথি পরীক্ষা, সম্পদের উৎস অনুসন্ধান এবং অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির নথি পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন।
